করোনার প্রভাবে কালাইয়ের ৩১টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধের পথে

করোনার প্রভাবে কালাইয়ের ৩১টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধের পথে

তৌহিদুল ইসলাম তালুকদার লায়নর, স্টাফ-রিপোর্টার


চলমান করোনাভাইরাসের প্রভাবে প্রায় ১৭ মাস ধরে বন্ধ আছে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার ৩১টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল। ঐসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো বন্ধ থাকায় বর্তমান নাজুক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ইতমধ্যে ২টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়েছে। অবশিষ্ট কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধের পথে। করোনার কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে না পারায় এবং ক্লাস পরীক্ষা না হওয়ায় উপজেলার প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো বন্ধ থাকার কারণে সবস্কুলের মাসিক বেতন ও ফি বন্ধ হয়ে গেছে।

এর ফলে স্কুল শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দিতে পারছেনা স্কুল পরিচালনা কর্তৃপক্ষ। তবে ঐসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষিকা ও কর্মচারীরা অনেক আগেই সংশ্লি¬ষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির নিকট থেকে নিয়োগ পেয়ে ছিলেন তারা। সেই অনুযায়ী শিক্ষক, শিক্ষিকারা নিয়মিত পাঠদানসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল সুযোগ-সুবিধা পেয়ে প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম পরিচালানার করার পর এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকতার মতো মহান পেশা না থাকায় বর্তমান জীবন-জীবিকা তাগিদে বিভিন্ন পেশায় যোগ দিয়েছেন তারা। আবার অনেকেই বাড়িতে বসে অলস সময় পাড় করছেন অনেক শিক্ষক ও শিক্ষিকারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালাই পৌরসভাসহ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৩১টি কিন্ডারগার্টেন স্কুর রয়েছে। ঐসব কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো করোনার পুর্বে নিয়মিত পাঠদানসহ প্রতিষ্ঠানে সকল কার্যক্রম চালু ছিলো। ঐসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪শ জন শিক্ষক, শিক্ষিকাসহ প্রায় ৭হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোই চলছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এতে করে উপজেলায় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘদিন বাড়িতে বন্দি থাকা কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কিছু সময় বাড়িতে পড়ালেও টিভি, স্মার্টফোন বা ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হয়ে শিশুরা শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। শিক্ষার জাতির মেরুদন্ড হলেও এই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনেকটা শঙ্কার মধ্যে রয়েছে আর অভিভাবকরা তাদেরকে নিয়ে পড়েছেন চরম বিপাকে। তবে দির্ঘী সময় স্কুল বন্ধের ফলে হতদরিদ্র এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা জীবন-জীবিকার জন্য শিক্ষাকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। আবার অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের রাতে আধারে বাল্য বিয়েও দিচ্ছেন। তবে অনলাইন ক্লাসের নামে শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার কথা বলা হলেও দারিদ্র্য, অদক্ষতা ও অবকাঠামোর দুর্বলতা ফলে এর কার্যক্রম তেমন সুফল হচ্ছেনা। ক্লাস করার জন্য প্রয়োজনীয় একটা মাঝারি মানের মোবাইল সেট কেনা প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবারের জন্য অনেক কষ্টকর হচ্ছে। তাছাড়া প্রতিদিনের জন্য ডেটা কেনা, সময় মতো বিদ্যুৎ না থাকা, নেটওয়ার্ক না পাওয়া, যিনি ক্লাস নেন সেই শিক্ষকের দক্ষতা এবং সাধারণ ক্লাস আর অনলাইন ক্লাস করানোর পার্থক্য না বুঝে ক্লাস নিতে না পাড়া ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। আবার অনলাইনে ক্লাস করা শিক্ষার্থীরা আনন্দ পাচ্ছে না, ক্লাসে মনোযোগ রাখতে পারছে না তারা, আর শিক্ষক পারছেন না পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিভাবে ক্লাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যা সব কিছু মিলে এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু চলমান করোনার প্রভাবে এই উপজেলার ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বর্তমান হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ঐসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বাড়ি ভাড়া, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতমধ্যে দেউলিয়া হয়ে গেছে। কেউ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন, কেউবা বিক্রি করে দিচ্ছেন তাদের স্বপ্নের বিদ্যালয়টি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরাও রয়েছেন বিপাকে। প্রায় ১৭ মাস ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না অনেকেই। যাদের সংসার শুধু এই শিক্ষকতা পেশায় চলে তাদের অনেকেই এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

উপজেলার বৈরাগিহাটের সানসাইন কিন্ডারগার্টেন এন্ড হাইস্কুলের চেয়ারম্যান ও প্রধান শিক্ষক মো. শাহিনুর রহমান বলেন, পড়াশোনা শেষ করে কোথাও চাকরি পাইনি। বেকার থাকার চাইতে কিছু করার চিন্তা থেকে কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি। শুরু থেকে ভালোই চলেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ২শ ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৯ জন শিক্ষকও নিয়োগ দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন থেকে প্রতিষ্ঠানের ভাড়া ও শিক্ষদের বেতন দিতাম। গত প্রায় ১৭ মাস বিদ্যালয়টি বন্ধ রয়েছে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়ে কিন্ডারগার্টেনটি বন্ধ করে দিয়েছি। এখন শিক্ষকতার মতো মহান পেশা বদল করে গরু পালন করছি।

উপজেলার মোলামগাড়ীহাটের এস.এ ক্যাডেটের চেয়ারম্যান আব্দুল আলীম বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যায়নরত ছিল। প্রায় ১৩ জন শিক্ষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিবছর ফলাফল ভালো হতো। চলমান করোনার কারণে আমি প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়েছি। স্কুল বন্ধ থাকায় কোনো অভিভাবক মাসিক বেতন দিচ্ছেনা। শিক্ষকদের নিয়ে এখন খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছি।

মিস্টার আলীম আরও বলেন, আমাদের দিন দিন দুশ্চিন্তা বেড়েই চলছে। পরিবারের সঞ্চয় করা টাকা থেকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে স্কুলের পেছনে ব্যয় করে আসছি। এভাবে স্কুল বন্ধ থাকলে প্রতিষ্ঠান বাঁচানো যাবে না। শিক্ষার্থীরা অন্যত্র চলে যাবে। বহু শিক্ষার্থী ঝরে যাবে সেই সঙ্গে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমে, শিশু নির্যাতন ও শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। এমন অবস্থায় সরকার আমাদের সাহায্য না করলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একেবাই বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা সরকারের সহযোগিতা চাই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিন্ডারগার্টেন স্কুল খুলে দিলে সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

উপজেলার আইডিয়াল প্রি-ক্যাডেট স্কুলের কর্মরত শিক্ষিকা মোছা. রোকেয়া বেগম বলেন, আমার বেতন নেই প্রায় ১৬ মাস ধরে। আগে প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন থেকে বেতন পেতাম। এখন সেটাও নেই। এর মধ্যে আবার আমার স্বামীর স্থায়ী কোনো চাকরিও নেই। স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে খুব হিমশিম খাচ্ছি।

উপজেলার হযরত মা কামাল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সহকারী শিক্ষক মো. এনামুল হক-এর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, স্কুলের বেতনের পাশাপাশি সংসারের ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত সময়ে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার চালাতাম। কিন্তু করোনার কারণে স্কুলের বেতন যেমন বন্ধ তেমনি বন্ধ রয়েছে প্রাইভেট পড়ানো। এখন সংসার চালান মতো সামর্থ্য নেই আমার। বর্তমান বেকার হয়ে বাড়িতে বসে বসে অলস সময় পাড় করছি।

উপজেলার কাকলি শিশুনিকেতনের শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাছরিন সুলতানা নিলা ও শাপলা বেগম বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল খোলা হলে আমাদের মতো অনেক সন্তানদের ভাল হতো। করোনার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমাদের সন্তানেরা প্রতিদিন বাড়ি থেকে স্কুলে যেত। সেটা তাদের অভ্যাস হয়ে ছিল। কিন্তু করোনার প্রভাবে তাদের সেই অভ্যাসে পরিবর্তন হয়েছে। তাদেরকে বুঝানো যাচ্ছেনা কেন তাদেরকে বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে। সবসময় তারা বাইরে যেতে চাচ্ছে। তাদেরকে ঘরে পড়তে বললে কিছু সময় ঘরে পড়ে টিভি বা মোবাইল খেলে বেশি সময় পাড় করছে। আবার কিছু করতে বললেই তার উত্তরে বলে আমি স্কুলে যাব। তাছাড়া দিন দিন তাদের বায়না বেড়েই চলেছে। এতে আমরা মাঝেমধ্যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি।
কালাই উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোছাঃ ইতিয়ারা পারভীন বলেন, কালাই পৌরসভাসহ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৩১টি ব্যক্তিমালিকানাধীন কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। চলমান করোনাভাইরাসের কারণে ইতমধ্যে ২টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়েছে। ঐসব প্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদান কিংবা প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কার্যালয়ে আমরা লিষ্ট পাঠিয়ে দিয়েছি।

এই বিষয়ে কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার টুকটুক তালুকদার বলেন, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের সরকারি অনুদান বা প্রণোদনা দেওয়ার মতো আমাদের কাছে এখন কোন নির্দেশনা আসেনি। যদি আসে তাহলে আমরা তাদেরকে দিয়ে দিবো। বর্তমান সারাদেশে লগডাউন চলছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো বন্ধ রয়েছে। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা করানো জন্য প্রতিটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস নিলে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করাতে পারবে। আর অভিভাবকেরা শিক্ষকদের প্রতি মাসের বিল-বেতনও দিতে চাইবেন।

মন্তব্য করুন

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




বিজ্ঞাপন

সর্বস্বত্ব সত্বাধিকার সংরক্ষিত © tulshigonga.com © এই পোর্টালের নিউজ ও ছবি অনুমতি ছাড়া কপি নিষেধ  
Design BY NewsTheme